অবশেষে মাদকের বিষাক্ত ছোবল থেকে এলাকা রক্ষার দায়িত্ব নিলো সাহসী যুবকরা

শামীম আহমেদ :
কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব পৌর এলাকার কমলপুর পশ্চিমপাড়া গ্রামের বাসিন্দাদের মাদকের সাথে বসবাস ছিলো দীর্ঘ ২০ বছর। কমলপুর (ওলাইক্কা হাটি) এলাকা ছিলো মাদক বিক্রি এবং সেবনের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ। এক সময়ে হিরোইন এবং বর্তমানে ভারতীয় নিষিদ্ধ ফেনডিল,ইয়াবা,গাঁজা এবং চোলাইমদ বিক্রয় এবং সেবন ছিলো এ এলাকার কিছু অসাধু ব্যাক্তিদের নিত্য দিনের কর্মকান্ড। প্রতি মাসে প্রায় ৭৩ লাখ টাকার মাদক বেচা-কেনা হয় এখানে। নিউ টাউন,আমলাপাড়া,পঞ্চবটিসহ বিভিন্ন এলাকার চিহিৃত কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ীরা এই এলাকাকে তাদের অসৎ ব্যবসার সবচেয়ে নিরাপদ ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হিসেবে বেঁছে নিয়েছে। এতে করে এলাকার মেধাবী শিক্ষার্থী, চাকুরীজীবী,ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ মাদকের সাথে জড়িয়ে তাদের সম্ভাবনাময় সুন্দর জীবন কে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করছে। ছাত্ররা নেশার টাকা জোগার করতে চুরি,ছিনতাই,ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে নিজেদের জড়িয়ে সমাজের অশান্তি সৃষ্টি করছে। মাদকে যখন প্রায় সিংহভাগ পরিবারের সদস্যরা আসক্ত এবং মাদক ব্যবসার সাথে সরাসরি জড়িত। বড় দুঃখের হলেও চির সত্য এই যে, এক সময় তারাই ভালো এবং সুন্দর সমাজের বাসিন্দা ছিলো। এলাকার প্রত্যেকটা ভালো কাজে তাদের অবদান ছিলো চোঁখে পড়ার মত। এই এলাকা যখন বিভিন্ন অপরাধে জর্জড়িত, দিনের বেলাতেও এখানে প্রকাশ্যে মাদক কেনা-বেচা হয়। উঠতি বয়সী তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীরা যখন চোঁখের সামনে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই এই এলাকার সাহসী ৪জন যুবক প্রতিজ্ঞা করে ৩০ লক্ষ শহীদ এবং ২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে উর্জ্জিত এই দেশের মানুষকে রক্ষা করতে হবে। নিজেদের জীবনের বিনিময়ে হলেও স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামে এলাকার সকল অপরাধমূলক কর্মকান্ড দূর করে অপরাধের সাথে সম্পৃত্ত ব্যক্তিদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে হবে। মস্তোফা কামাল,মাসুদুর রহমান জিসান, শামসুল হক বাদল ও সুমনরা কমলপুর পশ্চিম পাড়ার যুবকদের একত্রিত করে এবং ১৫ আগস্ট ২০২০ইং শুরু হয় তাদের স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম। “সকল ভেদাভেদ ভুলে সুন্দরকে নিবো তুলে” এ শ্লোগানকে সামনে রেখে মাদক বিরোধী যুদ্ধারা এলাকার সুশীল সমাজের ব্যক্তিদের সাথে নিয়ে ৪জন মাদক ব্যবসায়ী ও ৩ সেবনকারীকে আটক করে ভৈরব উপজেলা প্রশাসনের সহযোগীতায় ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে সাজা দিয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে প্রেরণ করে। শুধু তাই নয় আসামীদের পরিবারের সকল ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব নেয় এলাকার সাহসী যুবারা। হাজী মস্তোফা কামালকে সভাপতি ও মাসুদুর রহমান জিসান কে সাধারণ সম্পাদক করে কৃতি সন্তানেরা কমলপুর পশ্চিমপাড়া যুব সংগঠন নামে ৭১ সদস্য বিশিষ্ট্য একটি কার্যকরী কমিটি গঠন করে সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে আত্ম প্রকাশ করে। যার মোট সদস্য সংখ্যা ২০০ জন।
উল্লেখ্য যে, এ সংগঠনটি ৫জন বেকার যুবককে স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয় এবং সংগঠনের সকল সদস্য ও এলাকার স্থানীয় ব্যক্তিদের নিজস্ব অর্থায়নে একটি অর্থনৈতিক তহবিল গঠন করা হয়। তহবিলের সমস্থ অর্থ ব্যয় করা হবে অসহায়-গরীবদের চিকিৎসার্থে, বিবাহের কাজে ও এলাকার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানে।
কমলপুর পশ্চিমপাড়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, “এলাকার সকল অন্যায় ও অপরাধ নির্মূলের দায়িত্ব ছিলো আমাদের এবং স্থানীয় প্রশাসনের। আমরা স্থানীয় বিচারকরা যদি সঠিক বিচার করতাম এবং পুলিশ প্রশাসন যদি তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতো তাহলে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও আমার এলাকার এই অধপতন দেখতে হতো না। আমি আমার এলাকার যুবকদের প্রতি চির কৃতজ্ঞ। তাদের প্রত্যেকটা ভালো কর্মকান্ডে আমি আছি এবং থাকবো ইনশাআল্লাহ যতদিন বেঁচে থাকি। তারা আমাদেরকে নতুন করে দেখিয়ে দিলো কিভাবে অপরাধ নির্মূল করতে হয়”।
সুশীল সমাজের বিজ্ঞজনরা মনে করেন, দেশের প্রত্যকটা এলাকার যুবকরা যদি এরকমভাবে মানুষকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে সকল অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতো এবং বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ডাকে যেভাবে সকলে এক হয়ে দেশকে স্বাধীন করেছিল ঠিক সেভাবে স্বাধীনতা রক্ষার জন্যও যদি কাঁধে কাঁধ মিলে দেশের কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত রাখতো তাহলে থাকতোনা কোনো অপরাধ কর্মকান্ড আর দেশটা হতো সোনার বাংলাদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »