দুর্নীতি, লুটপাট আর নানা অনিয়মের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

বিশেষ প্রতিনিধি:
দুর্নীতি, লুটপাট আর নানা অনিয়মের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি)। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভিসি প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশিদ আসকারী নিয়োগ পাওয়ার পর একের পর এক কেলেঙ্কারির ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। অভিযোগ রয়েছে, ভিসির মদদপুষ্ট শিক্ষক-কর্মকর্তাদের একটি সিন্ডিকেট তিন বছর ধরে নানা অপকর্ম চালিয়ে আসছে।
শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্য, মেগা প্রকল্পের আড়ালে দুর্নীতি আর বিধি লঙ্ঘন করে দুই শতাধিক লোককে ডে-লেবার হিসেবে নিয়োগ দেয়ার ঘটনা এখন বহুল আলোচিত বিষয়। শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্যের একাধিক ফোনালাপের অডিও ক্লিপ এখন অনেকের হাতে। এসব অনিয়ম, দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের কঠোর শাস্তি দাবি করে আসছে শিক্ষক সংগঠন, বঙ্গবন্ধু পরিষদ ও কর্মকর্তা সমিতি। এসব সংগঠন ইতোমধ্যে লুটপাট ও অনিয়মের প্রমাণ প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী ও ইউজিসি চেয়ারম্যানের কাছে জমা দিয়েছে। শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্য : বর্তমান ভিসির আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে ৬৫জন।

এ নিয়োগে বড় অঙ্কের ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ে ফোনালাপের অন্তত ৫টি অডিও ক্লিপ ফাঁস হয়েছে। এর প্রতিটির সঙ্গে ভিসির ঘনিষ্ঠ লোকজন সম্পৃক্ত। প্রতি শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে ২০ লাখ থেকে শুরু করে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। সর্বশেষ শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার কথা বলে আরিফ খান নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর কাছে ২৮ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে দাবি করা অর্থের পরিমাণ কমিয়ে ১৮ লাখ টাকা করা হয়। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় আরিফ হাসান খান নামের ওই প্রার্থীকে তার সব যোগ্যতা থাকার পরও পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়নি। ফোনালাপ ফাঁসের পর তদন্ত কমিটি গঠন করেন ভিসি। তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন বাংলা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. সরওয়ার মুর্শেদ রতন। পরে সাবেক প্রক্টরসহ অন্যদের চাপে তিনি পদত্যাগ করেন। এতে থেমে গেছে তদন্ত কাজ।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ভিসি প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশিদ আসকারী বলেন, শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে ফোনালাপের অডিও তদন্ত করতে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী কঠোর শাস্তি দেয়া হয়েছে- এমন নজির রয়েছে। আরিফের বিষয়টি জানার পর তদন্ত টিম করেছিলাম। সেই কমিটির প্রধান পদত্যাগ করলে আরেকজনকে প্রধান করা হয়েছে। কমিটি তদন্ত করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্য : বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন কাজে ৫৩৭ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে গেছে। তবে কাজেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি বড় দুটি টেন্ডার ঘিরে ইবির প্রধান প্রকৌশলীকে হুমকি দেন সাবেক প্রক্টর মাহবুবর রহমান ও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাকিব। তারা একটি বড় কাজ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এক নেতাকে দেয়ার জন্য চাপ দেন। কাজ না দিলে পরিণতি ভয়াবহ হবে বলে মোবাইল ফোনে মেসেজ পাঠিয়ে হুমকি দেয়া হয়। এ ঘটনার পর প্রধান প্রকৌশলী আলিমুজ্জামান টুটুল পদত্যাগ করার ঘোষণা দেন। পাশাপাশি তিনি প্রধানমন্ত্রীকে সবকিছু জানিয়ে দেয়ার হুমকিও দেন। এ বিষয়ে ভিসি তদন্ত টিম গঠন করলেও শুধু তার ঘনিষ্ঠজনের জড়িত থাকায় তদন্ত থেমে আছে। এ বিষয়ে ভিসি বলেন, প্রধান প্রকৌশলীকে হুমকি দেয়ার পর তিনি পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। এরপর আমি কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছি। তদন্ত টিম করেছি। করোনার কারণে টিম কাজ করতে পারছে না।

ডে-লেবার নিয়োগে ঘাপলা : ভিসিসহ তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও দাবি নিয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও ছাত্রলীগের বড় একটি অংশ আন্দোলনে নামে। এর মধ্যে বড় একটি অভিযোগ ডে-লেবার নিয়োগ। অতি সম্প্রতি ছাত্রলীগের কিছু সাবেক নেতাকর্মী, ভিসি ও সাবেক প্রক্টরের ঘনিষ্ঠজনদের ডে-লোবার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। যার সংখ্যা দুই শতাধিক। তাদের বেশির ভাগই কাজ না করেই প্রতি মাসে বেতন নিচ্ছেন। অবৈধভাবে নিয়োগ দিয়ে এদের রাজস্ব খাত থেকে বেতনভাতা দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ব্যাপারে ভিসি ডা. হারুন-উর-রশিদ আসকারী বলেন, বিষয়টি আমার নজরে আসায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। কমিটি এখনও রিপোর্ট দেয়নি। তাদের তাগাদা দিয়েছি দ্রুত রিপোর্ট দেয়ার জন্য।

শিক্ষক সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনে বিভাজন সৃষ্টি : শিক্ষকদের অভিযোগ, সুকৌশলে সাবেক প্রক্টর ড. মাহবুব রহমান ভিসিকে ভুল বুঝিয়ে শিক্ষক সমিতিসহ সব সংগঠনের মাঝে বিভেদ তৈরি করে রেখেছেন। ইবিতে শিক্ষক সমিতি, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, কর্মকর্তা সমিতি, কর্মচারী সমিতি ও ছাত্রলীগের মাঝে বিভেদ তৈরি করা হয়েছে। ভোটে হেরে ভিসিপন্থীরা রাতারাতি জামায়াত-বিএনপি ও জাসদের লোকজনকে সামনে এনে তাদের দিয়ে পাল্টা কমিটি করেছেন।
বঙ্গবন্ধু পরিষদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক শিক্ষক নেতা প্রফেসর ড. মাহাবুবুল আরেফিন বলেন, উত্তরাঞ্চলের একটি সিন্ডিকেট ভিসি হারুন-উর-রশিদ আসকারীকে গ্রাস করেছে। ভিসির নানা দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অন্তত একডজন শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। মেগা প্রকল্পের আড়ালে হরিলুট, ডে-লেবার নিয়োগে দেয়ার নামে অর্থ লুটপাটে জড়িয়েছেন তারা। যার প্রমাণ গত চার বছরে ৫টি অডিও ফাঁস।

কর্মকর্তা সমিতির সাধারণ সম্পাদক মীর মুর্শেদুর রহমান বলেন, ভিসি ইবিকে তলানিতে নিয়ে গেছেন। উন্নয়নের আড়ালে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ভিসি ও তার লোকজন।

ইবি শাপলা ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সিনিয়র শিক্ষক প্রফেসর ড. মুঈদ রহমান বলেন, ভিসি একটি সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। তার সময়কালে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, মেগা প্রকল্পে দুর্নীতিসহ নানা বিষয় সামনে এসেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »