মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আগামী ৩ নভেম্বর

অনলাইন নিউজ ডেক্স:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আগামী ৩ নভেম্বর। এরই মধ্যে নানা ফ্রন্টে ভোটের রাজনীতি বেশ জমে উঠেছে, যার একটি হলো বিচারালয়। বিচারালয়ের ফ্রন্ট বিশেষভাবে জমে উঠেছে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের জনপ্রিয় ও প্রগতিশীলতার প্রতিভূ বিচারপতি রুথ বেডার গিন্সবার্গের মৃত্যুর কারণে সৃষ্ট শূন্য পদে নিয়োগ নিয়ে, যার প্রভাব রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইতিমধ্যে এ পদে নিয়োগের জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফেডারেল আপিল কোর্টের বিচারক চরম রক্ষণশীল অ্যামি ক্লোনি ব্যারেটকে মনোনয়ন দিয়েছেন, যে মনোনয়ন মার্কিন সিনেটকে অনুমোদন দিতে হবে। মার্কিন সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে এ অনুমোদন পুরোপুরি নিশ্চিত, যদিও ডেমোক্রেটিক পার্টি নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এ নিয়োগের চরম বিরোধী।

আসন্ন নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করতে পারে, এমন বিষয় নিয়ে এরই মধ্যে অনেক আইনি লড়াই চলছে। আইনি লড়াইগুলো এখন নিম্ন আদালতে ঘটছে, যেগুলো সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়াতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান আট বিচারপতির মধ্যে পাঁচজন রিপাবলিকান এবং অন্য তিনজন ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট দ্বারা মনোনীত। তাই বর্তমান শূন্য পদে ট্রাম্পের মনোনীত অ্যামি ব্যারেটকে নিয়োগ দিতে পারলে, নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে বিরোধ যদি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়, তাহলে আদালতের রায় তাঁর পক্ষে যাবে বলে ধরে নেওয়া হয়। বস্তুত এ নিয়োগ এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে বিপর্যস্ত মার্কিন অর্থনীতিকে চাঙা করার জন্য জরুরি প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে আলোচনা বাতিল করে ৩ নভেম্বরের আগে ব্যারেটের নিয়োগ নিশ্চিত করার ওপর তিনি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
নির্বাচন নিয়ে আইনি লড়াইয়ের মূল বিষয় জনগণের ভোটাধিকার–সম্পর্কিত। ডেমোক্রেটিক পার্টি ভোটাধিকার সম্প্রসারণের পক্ষে, যার মাধ্যমে আফ্রিকান, আমেরিকান ও অন্যান্য অশ্বেতাঙ্গদের, যাদের অধিকাংশ ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থক ভোটাধিকার নিশ্চিত হবে। পক্ষান্তরে সংগত কারণেই রিপাবলিকান পার্টি সংখ্যালঘু ভোটারদের ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।

ভোটাধিকার সম্প্রসারণ-সংকোচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো আগাম ভোটের সুযোগ। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় বিকেন্দ্রীভূত ভোটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব অঙ্গরাজ্যগুলোর। তাই সে দেশে ভোট প্রদানের বিষয়ে প্রযোজ্য আইনকানুনের মধ্যে অনেক অসামঞ্জস্য রয়েছে। এ অসামঞ্জস্য ব্যাপকভাবে বিরাজমান আগাম ভোট দেওয়ার বিধানের ক্ষেত্রেও।

বিভিন্ন কারণে ভোটারদের আগাম ভোট দিতে দেওয়া হয়, যার একটি হলো নির্বাচনের সময় ভোটারদের নির্বাচনী এলাকায় অনপুস্থিতি। অনপুস্থিতির কারণে আগাম ভোট দিতে চাইলে ভোটরদের আগে থেকেই ব্যালটের জন্য অনুরোধ পাঠাতে হয়। তবে অনেক অঙ্গরাজ্যে সব ভোটারকেই ডাকযোগে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে আগাম ভোটের সুযোগ দেওয়া হয়। এসব অঙ্গরাজ্যে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচনের আগেই ভোটারদের ব্যালট প্রেরণ করা হয়, যা পূরণ করে তাঁরা ডাকযোগে ফেরত পাঠান। কিছু অঙ্গরাজ্যে তাঁরা নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপিত ড্রপবক্সেও পূরণ করা ব্যালট জমা দিতে পারেন।
বিচারক নিয়োগের বিষয়টি আরেকটি কারণেও গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন থেকেই নির্বাচনকে বিতর্কিত করার জন্য উঠেপড়ে লেগে গেছেন। তিনি তাঁর সমর্থকদের সহিংস আচরণের জন্যও উসকানি দিচ্ছেন। মিশিগান অঙ্গরাজ্যকে ‘লিবারেট’ করার ট্রাম্পের উসকানির কারণে মিশিগানের ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে নির্বাচিত গভর্নরকে অপহরণ করার অভিযোগ তাঁর শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদী অনুসারীদের ১৩ জন সম্প্রতি গ্রেপ্তার হয়েছে। ভোটে হেরে গেলে জালিয়াতির এবং তাঁর সমর্থকদের হয়রানির অভিযোগ তুলে তিনি সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ব্যাটল গ্রাউন্ডের ছয়টি অঙ্গরাজ্যের আইনসভাকে যেগুলোতে রিপাবলিকান পার্টি বর্তমানে সংখ্যাগরিষ্ঠ তাঁর সমর্থকদের মধ্য থেকে ইলেকটরাল কলেজের সদস্যদের মনোনীত করতে এবং তাদের প্রেসিডেন্ট পদে ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা প্রদানের অনুরোধ করতে পারেন। প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের জন্য জনসংখ্যার ভিত্তিতে ইলেকটরাল কলেজের সদস্যসংখ্যা নির্ধারিত থাকে। নির্বাচনে যে প্রার্থী ২৭০ জন ইলেকটরাল কলেজের সদস্যের সমর্থন পান, তিনিই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, যে রাজ্যে যে প্রার্থী সংখাগরিষ্ঠ জনগণের ভোট পাবেন, তিনিই সেই অঙ্গরাজ্যের জন্য নির্ধারিত সব ইলেকটরাল কলেজের সদস্যের সমর্থন পাবেন। তবে সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে এ বাধ্যবাধকতা শিথিল করার ক্ষমতা প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের আইনসভাকে প্রদান করা হয়। আটলান্টিক ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে রিপাবলিকান পার্টির কিছু নেতাকে এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। এমন ঘটনা যদি বাস্তবে ঘটে, তাহলে নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়াতে বাধ্য এবং সে কারণেও তড়িঘড়ি করে বিচারপতি গিন্সবার্গের শূন্য পদে নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া ট্রাম্পের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »