হাঁস পালনে স্বাবলম্বী নওগাঁর রাণীনগরের দেলোয়ার হোসেন

এমরান মাহমুদ প্রত্যয়,নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি :

হাঁস পালনে স্বাবলম্বী হয়েছেন নওগাঁর রাণীনগরের দেলোয়ার হোসেন । আমাদের দেশে হাঁস পালন একটি লাভজনক পেশা। হাঁস পালন করে অনেক বেকার মানুষ স্বাবলম্বী হচ্ছেন। নওগাঁ জেলার রাণীনগর উপজেলার মিরাট ইউনিয়নের হামিদপুর গ্রামের অল্প শিক্ষিত-দরিদ্র দেলোয়ার হোসেন। বর্তমানে তিনি হাঁসের খামার করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। সংসারে এনেছেন স্বচ্ছলতা। মুক্তি পেয়েছেন আর্থিক দৈন্যতা থেকেও। কঠোর পরিশ্রম আর অভিজ্ঞতার ফলে যে কোনো কাজে যে কেউ স্বাবলম্বী হতে পারেন বলে প্রমাণ করেছেন দেলোয়ার হোসেন। উপজেলার মধ্যে যে ক জন হাঁস খামারি আছে,তার মধ্যে তিনি এখন সফল হাঁস খামারি হিসেবে পরিচিত। সুখের আশায় বাড়ির সবাই এ খামারে পরিশ্রম করে চলেছেন। সুদিনের মুখও দেখতে শুরু করেছেন তারা। খামার থেকে অর্জিত আয় দিয়ে এখন ছেলে মেয়েদের পড়ালেখা, সংসারের খরচ সবই চলছে। দেলোয়ার হোসেন আগামীতে তার খামারটা আরও বড় করার জন্য কিছু জমি কেনার চেষ্টা করছেন। রাণীনগর সহ জেলার অন্যান্য উপজেলার অনেক দরিদ্র পরিবার হাঁস পালনের মধ্য দিয়ে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন, তাদের হয়েছে দিন বদল। কিছুদিন আগেও দেলোয়ার হোসেনের পরিবারে অভাব অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। আর এ অভাবের তাড়নায় পেটের দায়ে দেলোয়ার বিভিন্ন এলাকায় কাজ করতেন।অনেক জায়গায় হাঁস-মুরগির খামার দেখতেন। এবং ধারণা নিতেন অনেক খামারিদের কাছে থেকে। স্বপ্ন দেখতেন নিজের একটি খামারের।কিছু অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ২০১৯ সালে নিজ এলাকায় হাঁসের খামার করার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৯ সালের শুরুতে হাঁসের খামার করার জন্য হামিদপুর এলাকায় কিছু নিচু জমি অল্প সময়ের জন্য নেন। খামারের একপাশে ৪৫ শতাংশ জমিতে গভীর পুকুরের পাড় ঘেষে,পাশেই অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় একটি ঘর তৈরি করেছেন। ওই ঘরেই হাঁস ও দেলোয়ার হোসেন নিজে রাত যাপন করেন। দেলোয়ার হোসেন জানান, দেশে বিভিন্ন জাতের হাঁস থাকলেও বা পালন করা হলেও অধিক ডিম উৎপাদনকারী খাকী ক্যাম্বল জাতের হাঁস পালন করে তিনি অধিক লাভবান হচ্ছেন। তিনি জানান, বগুড়া ও পাবনা এলাকা থেকে একদিনের প্রতিটি বাচ্চা ৩৫ টাকা করে কিনে আনেন। পরিবহনসহ প্রতিটি বাচ্চার পেছনে প্রথম দিনেই খরচ হয় ৪০ টাকা করে। এতে করে ৫০০টি একদিনের বাচ্চা বাবদ ২০,০০০ হাজার টাকা, বিদ্যুৎ লাইন, সংযোগ ও বৈদ্যুতিক মটর বাবদ ২২ হাজার টাকা, হাঁস ও নিজে থাকার জন্য ঘর নির্মাণ বাবদ ১০ হাজার টাকা, জমিতে জাল দিয়ে হাঁসের জন্য ঘেরা দেওয়া বাবদ ৪০ হাজার টাকা ও অন্যান্য খরচসহ সর্বসাকুল্যে ব্যয় হয় প্রায় ১ লক্ষ টাকা। এতে প্রায় কিছু টাকা নিজের আয়ের পুঁজি এবং বাকি টাকা ঋণের। দেলোয়ার হোসেন জানান, বাচ্চা আনার দেড় মাসের মধ্যে উপজেলার মিরাট ইউনিয়নের হামিদপুর এলাকার সহ কয়েকজনের কাছে কিছু হাঁস প্রতিটি ২৯০ টাকা করে বিক্রি করেছেন। একটু অসাবধানতায় কিছু হাঁস মারা যাওয়ায় একটু ক্ষতিতে পড়লেও তা কেটে উঠে সময় সাপেক্ষে এবং অটুট মনবলে। বর্তমানে তার খামারে ২৫০টি বড় হাঁস আছে। এর মধ্যে ২৫০টি মাদী। ২৫০টি মাদী হাঁসের মধ্যে ৪ মাস আগে থেকে ১০০টি হাঁস ডিম দেওয়া শুরু করে। বর্তমানে তা বেড়ে প্রতিদিন ১৯০ থেকে ২০৫টি হাঁস নিয়মিত ডিম দিচ্ছে। খুচরা হিসেবে প্রতি হালি হাঁসের ডিম ৪০ টাকা করে এবং পাইকারি শতকরা হিসেবে ১০০ ডিম বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা থেকে ৯০০ টাকা করে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, অল্প কিছুদিনের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগ মাদী হাঁস ডিম দেওয়া শুরু করবে। এতে করে প্রতিদিন ২২৫টি হাঁস ডিম দেবে। তবে প্রতিদিন অন্তত ১০০টি ডিম বিক্রির টাকা হাঁসের খাবার ও অন্যান্য ব্যয় বাবদ খরচ হবে। ব্যয় ছাড়াও দৈনিক এক হাজার ২০০ টাকা থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা তার আয় থাকবে। এ হিসেব মতে প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা থেকে ৪৫ হাজার টাকা তার লাভ হবে। ফলে বছরে তার লাভ দাঁড়াবে ৪ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা। দেলোয়ার হোসেন বলেন, আগামী ভাদ্র মাস পর্যন্ত আমার খামারের মাদী হাঁসগুলো ডিম দেবে। খাকী ক্যাম্বেল জাতের হাঁস ২৪ মাস বয়স পর্যন্ত নিয়মিত ডিম দেয়। পরে আস্তে আস্তে কমতে থাকে। তাই ২৫ মাস বয়সের পরে আমার খামারের হাঁসগুলো বিক্রি করে দেব। তখন এসব হাঁস প্রতিটি কমপক্ষে ৩০০ টাকা করে বিক্রি করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি। তিনি আরো বলেন,উপজেলা বা জেলার প্রাণী কর্মকর্তা যদি একবার আমার এই হাঁসের খামারটি পরিদর্শন করে আমাকে আরো কিছু ধারণা দিতেন তাহলে আমি আমার খামারটি বড় করতাম। গ্রামবাসীরা জানান, কিছুদিন অগেও দেলোয়ার হোসেনের সংসারে অভাব-অনটন ছিল, কিন্তু হাঁসের খামার করার পর তার অভাব দূর হয়েছে। সংসারে স্বচ্ছলতা ও জীবনে সফলতা এসেছে। তারা বলেন, হাঁসের খামার করে দেলোয়ারের মতো যে কেউ সংসারের অভাব দূর করতে পারেন, হতে পারেন স্বাবলম্বী। এরই মধ্যে রাণীনগর সহ বিভিন্ন জেলা উপজেলার অনেকে হাঁস পালনের মধ্য দিয়ে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন, বদলে গেছে তাদের দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »